না ফেরার দেশে চিত্রনায়িকা দিতি

পারলেন না পারভীন সুলতানা দিতি। দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করে অবশেষে আত্মসমর্পণ করলেন নন্দিত এই অভিনেত্রী। আজ রোববার বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না…..রাজিউন)।
রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের মিডিয়া মুখপাত্র ডা. সাগুফতা।
ভারতের মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব অর্থোপেডিকস অ্যান্ড ট্রমাটোলজি (এমআইওটি) হাসপাতাল টানা ৩ মাস চিকিৎসার পর গত ৮ জানুয়ারি অসুস্থতা নিয়েই দেশে ফেরেন দিতি। সেদিনই তাকে সরাসরি ভর্তি করানো হয় গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে।

দিতিকে নিয়ে তারকারা যা বললেন
শবনম: দিতির সঙ্গে আমি দুটো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। একটি পাকিস্তান বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার ‘লেডি কমান্ডো’ এবং অন্যটি সুভাষ দত্তের ‘সহধর্মিণী’। আপাদমস্তক একজন ভালো মানুষ ছিল দিতি। সবসময়ই হাসি তার মুখে লেগেই থাকত। এমন মানুষ ইন্ডাস্ট্রিতে বিরল। আমি তার আত্মার শান্তি কামনা করছি।
উজ্জ্বল: দিতির প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘আমিই ওস্তাদ’ চলচ্চিত্রে আমি তার বড় ভাইয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। আর তার অভিনীত মুক্তিপ্রাপ্ত সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘রাজা বাবু’তে আমার স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিল। সত্যি বলতে কী খুব দুঃখ হয় দিতির এভাবে চলে যাওয়াটা নিয়ে। এটা সত্যি যে শিল্পীদের অনেক যুদ্ধ করতে হয়, সংগ্রাম করতে হয়। দিতির সেই সাহস ছিল যুদ্ধে জয়ী হবার। জীবন যুদ্ধে দিতি জয়ী হয়েছিল। কিন্তু মরণব্যাধি ক্যান্সারের কাছে তাকে হার মানতে হলো। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন।
ববিতা: দিতি আর আমি বলা যায় আমরা একই পরিবারের সদস্য। সোহেল খুন হবার পর মেয়েটা খুব কষ্ট করে দুই ছেলে-মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করার চেষ্টা করেছে। সত্যি বলতে কী দিতি আমার জুনিয়র হলেও তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল বন্ধুর মতো। আউটডোরে যখন শুটিং-এ যেতাম তখন আমরা এক গাড়িতে করেই শুটিং-এ যেতাম। গল্প করতে করতে পথ হয়তো শেষ হয়ে যেতো কিন্তু গল্প শেষ হতো না। আমার নিজের প্রযোজনা সংস্থা থেকে ‘চণ্ডিদাস ও রজকিনী’ চলচ্চিত্রে তাকে নিয়ে কাজ করেছিলাম। একজন ডেডিকেটেড শিল্পী ছিল দিতি। তার সঙ্গে ‘দোষী’, ‘চার সতীনের ঘর’সহ বেশ কটি চলচ্চিত্রে কাজ করেছি। সর্বশেষ তাকে যখন দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম তখন আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে চুমো খাচ্ছিল বার বার। সেই শেষ স্মৃতি কখনোই ভুলব না। দোয়া করি আল্লাহ যেন তাকে বেহেশতবাসী করেন।
ইলিয়াস কাঞ্চন: আমাদের প্রত্যেককেই দিতির মতো একদিন চলে যেতে হবে। তার এভাবে চলে যাওয়া থেকে আমাদের সবাইকে শিক্ষা নিতে হবে যে আমাদের কে যেকোনো সময় আল্লাহর কাছে চলে যেতে হবে। দিতি আমার একজন ভালো সহকর্মী ছিলেন। তার চলে যাওয়ায় শুধু একটি কথাই বলব আর তা হলো আল্লাহ যেন তার গুণাহ ক্ষমা করে দিয়ে তাকে বেহেস্ত নসিব করেন।
শর্মিলী আহমেদ: দিতির সঙ্গে পেশাগত সম্পর্কের বাইরে পারিবারিক সম্পর্ক ছিল আমার। আমাকে ‘মা’ বলে ডাকত। বিশেষ করে তার মা মারা যাবার পর থেকে আমাকেই যেন মা বলে ডাকত সবসময়। তার নির্দেশনাতে শেষ কয়েকটি কাজ আমি করেছি। আমাকে প্রায়ই বলত, ‘মা তুমি ছাড়া কাজ করতে আমার ভালো লাগে না।’ আমার গর্ভে হয়ত তাকে ধরিনি। কিন্তু সে ছিল আমার বড় মেয়ে। তার এভাবে চলে যাওয়াটা একজন মা হিসেবে আমি মেনে নিতে পারছি না। এতো অল্প বয়সে তাকে এভাবে চলে যেতে হবে এটা কল্পনা করিনি কখনোই। সত্যিই আজ বড় কষ্ট হচ্ছে দিতির কথা ভেবে। প্রতিমুহূর্তেই ভাবছি হয়তো একটু পরেই পেছন থেকে আমাকে ধরে ‘মা’ বলে ডাক দেবে।’
ডলি জহুর: গত বছর ৩১ মার্চ দিতির জন্মদিনে আমরা কতোই না মজা করে ছিলাম, সে স্মৃতি আজ চোখে ভাসছে। আমার দোস্ত ছিল দিতি। আমরা কেউ কখনোই জিজ্ঞেস করিনি কার বয়স কতো। দিতি আর আমি যখন টিভিতে একসঙ্গে কাজ করি তখন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব। তারপর তো সে ফিল্মে কাজ শুরু করল, আমিও ফিল্মে কাজ শুরু করলাম। আমাদের মধ্যে বন্ধুত্ব আরো গাঢ় হলো। কিন্তু তার সঙ্গে শেষ দেখা হলো না। কারণ আমি এখন অস্ট্রেলিয়ায়। দোয়া করি আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসিব করুন।
অপূর্ব: দিতি মা’র সঙ্গে তার নির্দেশনাতে কাজ করার আগে থেকেই আমার পরিচয় ছিল। তিনি প্রথম যেদিন আমাকে তার নির্দেশনায় নাটকে কাজ করার জন্য ফোন করেছিলেন আমার আজো মনে আছে, ‘আমি শুধু বলেছিলাম, আপনার কবে ডেট লাগবে বলেন।’ একথা শুনে তিনি অবাক হয়ে আমাকে বললেন, ‘শিগগিরই তোমাকে জানাচ্ছি।’ এরপরতো তার নির্দেশনায় প্রথম কাজ করেছি এবং পরে আরো বেশ কয়েকবার কাজ করেছি। একজন মমতাময়ী মা-ই ছিলেন তিনি আমার কাছে। তার সঙ্গে শেষ দেখা হয়েছে তার নির্দেশিত নাটকেই কাজ করতে গিয়ে। এরপর আর দেখা করার সুযোগ হয়নি। তাই নিজেকে আজ কিছুটা অপরাধীও মনে হচ্ছে। তবে দোয়া করি আল্লাহ যে মা’কে বেহেস্ত নসিব করেন।
আমিন খান: দিতি আপুর সঙ্গে আমি ‘বোনের মতো বোন’ চলচ্চিত্রে কাজ করি। এই চলচ্চিত্রে তিনি আমার বড় বোনের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। সেই থেকে তিনি আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো আদর স্নেহ করতেন। এমন একজন হাস্যোজ্জ্বল মানুষ এভাবে চলে যাবেন ভাবিনি কখনো। আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসিব করুন।
রিয়াজ: দিতি আপুর সঙ্গে চলচ্চিত্রের আসার প্রথমদিন থেকেই আমার বেশ ভালো পরিচয় এবং পারিবারিক সম্পর্ক। সৈয়দ হারুনের একটি চলচ্চিত্রে তারসঙ্গে প্রথম অভিনয় করি। এরপর ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’, ‘সুইটহার্ট’সহ আরো বেশকিছু চলচ্চিত্রে অভিনয় করি। একজন মানুষ কতোটা উদার আর মহান হতে পারেন দিতি আপা ছিলেন তার যথাযথ উদাহরণ। এমন মানুষ সত্যিই আমাদের চলচ্চিত্র জগতে খুবই কম আছেন। তার এভাবে চলে যাওয়াটা সত্যিই মেনে নেবার মতো নয়। দোয়া করি আল্লাহ যেন তাকে বেহেস্ত নসিব করেন।
ওমর সানী: দিতির সঙ্গে প্রথম কাজ করি সৈয়দ হারুনের নির্দেশনায় ‘চরম আঘাত’ চলচ্চিত্রে। এরপর আর কাজ করা হয়ে ওঠেনি। তবে আমরা সর্বশেষ বদিউল আলম খোকনের নির্দেশনায় ‘রাজা বাবু’ চলচ্চিত্রে একসঙ্গে কাজ করি। এটি ছিল দিতি অভিনীত সর্বশেষ চলচ্চিত্র। দোয়া করি আল্লাহ যেন তাকে বেহেস্ত নসিব করেন।
ফেরদৌস: আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘কাল সকালে’ চলচ্চিত্রে দিতি আপুর সঙ্গে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। এরপর আর কাজ করার সুযোগ হয়নি। দিতি আপু অসাধারণ একজন মানুষ ছিলেন। তার মতো এতো বিনয়ী, এতো হাসিখুশি মানুষ চলচ্চিত্রে দেখিনি আমি। আমার দুভার্গ্য যে হয়তো তাকে শেষ দেখাটা দেখতে পারব না। কারণ আমি একটি জরুরি কাজে দিনাজপুর এসেছি।
শাহনূর: দিতি আপুর মৃত্যুর খবর শুনে প্রথমে ভেবেছিলাম অন্যান্য সময়ের মতো গুজবই হবে। কিন্তু শেষতক শুনলাম সত্যিই দিতি আপু আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আমি লন্ডনে আছি, আপুর সঙ্গে শেষ দেখাটা হবেই না। এ কেমন ভাগ্য আমার। অথচ তিনি আমার বড় বোনেরই মতো। আপুর সঙ্গে জীবনে একটি ছবিতে অভিনয় করেছি। সেটি হলো ‘রাজা বাবু’। নাটকে অভিনয় করেছি ‘জীবনের গল্প’, ‘জীবন সংসার’সহ আরো বেশ কটি নাটকে। সবই যেন আজ স্মৃতি হয়ে চোখে ভাসছে।
পূর্ণিমা: চলচ্চিত্রে আমার প্রিয় মানুষদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন দিতি আপা। তার এভাবে চলে যাওয়াতে সত্যিই ভীষণ ক্ষতি হয়ে গেল আমাদের। দিতি আপু শুধু একজন অভিনেত্রীই ছিলেন না আমাদের একজন অভিভাবকও ছিলেন। তারসঙ্গে ‘আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা’ চলচ্চিত্রে কাজ করেছি। একজন মানুষ কতোটা বড় মনের হতে পারে তিনি যেন তারই উদাহরণ।

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

West Indies 300/10 v Sri Lanka 334/8 & 253/10 *

Hampshire 277/4 * v Yorkshire