প্রশ্ন রেখে গেলেন সালাউদ্দিন-মুজাহিদ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বরাবরই আলোচিত ছিলেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। তাদের ব্যঙ্গাত্মক কথায় নানাভাবে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে বিভিন্ন মহলে। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা করা, না করা নিয়ে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক মাঠের মতই ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলেও প্রশ্ন রেখে গেলেন এই দুই রাজনীতিক।

রবিবার প্রথম প্রহর রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয় সালাউদ্দিন ও মুজাহিদের। আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে একই মঞ্চে পাশাপাশি ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। জল্লাদ শাজাহান ও রাজু তাদের ফাঁসি কার্যকর করেন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত-সমালোচিত মুখ সালাউদ্দিন ও মুজাহিদ। একজন বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং আরেকজন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল।

প্রশ্ন রেখে গেলেন সালাউদ্দিন-মুজাহিদ

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার শনিবার রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে প্রায় এক ঘণ্টা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে আসেন তার পরিবারের ৩৫ সদস্য। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে এ সময় গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘তার বাবা বলেছেন, ‘এসব (প্রাণভিক্ষা) বাজে কথা, কে বলেছে? এ সরকারের সময় কত কাগজ বের হবে!’’

‘এ সরকার আমার বাবাকে নির্বাচনে হারাতে পারবে না জেনে কিছুক্ষণের মধ্যে তার জান নিয়ে নেবে’- এ কথা বলে তিনি গাড়িতে উঠে পড়েন।

বিএনপির মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন দলের পক্ষে এক বিবৃতিতে শনিবার রাত ১১টা ৪৯ মিনিটে জানান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে প্রাণভিক্ষা চাননি। তার পরিবার বিএনপিকে অবহিত করেছেন এ মর্মে একটি বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপপ্রয়াস চলছে, যা আদৌ সত্য নয়। যে অভিযোগে তাকে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়েছে, এ ধরনের কোনো অপরাধ তিনি করেননি, যা তিনি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে আদালতেও যুক্তি ও দালিলিক প্রমাণ দাখিল করেছিলেন। কিন্তু তিনি ন্যায়বিচার পাননি।

এদিকে, শনিবার রাত ১২টা ২০ মিনিটে কারাগারে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে আসেন পরিবারের ২৭ সদস্য। মুজাহিদের ছেলে আলী আহমদ মাবরুর সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে আমার বাবার প্রাণভিক্ষার কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যাচার। বাবা আমাদের বলেছেন, তিনি প্রাণভিক্ষা চাননি। উনার (মুজাহিদ) সম্পর্কে প্রশাসন মিথ্যাচার করেছে। বিগত পাঁচটা বছর উনার (মুজাহিদ) নামে মিথ্যাচার করে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। আজ তার জীবনের শেষ সময়ে এসেও তার বিষয়ে (প্রাণভিক্ষা) মিথ্যাচার করা হয়েছে।

আলী আহমদ মাবরুর বলেন, তিনি (মুজাহিদ) কোনো মার্সি পিটিশন করেননি। দেশের কাছে, দলের কাছে, পরিবারের কাছে হেয় করা ও কাপুরুষ বানানোর জন্য এই মিথ্যাচারের নাটক তৈরি করা হয়েছে।

মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের পর শনিবার রাত দেড়টার দিকে গণমাধ্যমে এক বিবৃতিতে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমাদ ফাঁসি কার্যকরের প্রতিবাদ জানিয়ে সোমবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল এবং রবিবার সারাদেশে গায়েবানা জানাজা কর্মসূচির ঘোষণা দেন।

মকবুল আহমাদ তার বিবৃতিতে মুজাহিদ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত এবং প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। রাষ্ট্রপতির কাছে মুজাহিদের প্রাণভিক্ষার আবেদনটি সরকারের মিথ্যা প্রচারণা বলে দাবি করেন তিনি। এর আগে, শনিবার বিকেলে আরেকটি বিবৃতিতে দলটির ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানও মুজাহিদের প্রাণভিক্ষা আবেদনটিকে মিথ্যাচার বলে অভিহিত করেন।

প্রাণভিক্ষা চাওয়া, না চাওয়া

১৮ নভেম্বর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের রিভিউয়ের আবেদন খারিজের পরের দিন কারাগারে তাদের সঙ্গে আলাদাভাবে দেখা করেন স্বজনরা। উভয় পরিবার সালাউদ্দিন ও মুজাহিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের জানান, তারা আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রাণভিক্ষা বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন। এরপর সালাউদ্দিন ও মুজাহিদের আইনজীবীরা তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য কারাগারের সামনে শুক্রবার দিনভর অপেক্ষা করেও অনুমতি পাননি। শনিবার দুপুর থেকে কারা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর আসে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেছেন। পরবর্তীতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ সরকারের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাও এমনটা জানান। কিন্তু, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মুজাহিদের পরিবার পক্ষ থেকে শুরু থেকেই প্রাণভিক্ষার বিষয়টি ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’ বলে মন্তব্য করেন।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, ‘আব্বা এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে আমার বিশ্বাস হয় না। সাক্ষাৎ করে সরাসরি তার সঙ্গে কথা না বলা পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারি না।’ অন্যদিকে, মুজাহিদের ছেলে আলী আহমদ মাবরুর শনিবার দুপুরে বলেন, ‘এটি বোগাস। তিনি এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আমাদের সাক্ষাতের সময় বলেননি।’

এদিকে, মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না— তা জানতে শনিবার কারাগারে পাঁচ ঘণ্টা অবস্থান করেন ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার মোর্শেদুর রহমান ও তানভীর আহমেদ। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় কারাগারে প্রবেশ করেন তারা। বিকেল ৩টা ২৫ মিনিটে সেখান থেকে তারা বের হয়ে যান। দুই ম্যাজিস্ট্রেট কারাগার থেকে বের হয়ে আসার কিছুক্ষণ আগেই প্রাণভিক্ষার আবেদনপত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়ে ডেপুটি জেলার সর্বোত্তম দেওয়ান ও আরিফুজ্জামান কারাগারে প্রবেশ করেন।

শনিবার সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দ্য রিপোর্টকে জানান, রাষ্ট্রপতির কাছে করা সালাউদ্দিন ও মুজাহিদের মার্সি পিটিশন বা প্রাণভিক্ষার আবেদন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছেছে।

মন্ত্রণালয় থেকে আইন সচিব শনিবার রাতে প্রাণভিক্ষার আবেদন নিয়ে গুলশানে আইনমন্ত্রীর কার্যালয়ে যান। সেখানে আইনমন্ত্রী তাতে স্বাক্ষর করেন। শনিবার রাত ৮টা ৪০ মিনিটে প্রাণভিক্ষার আবেদন নিয়ে বঙ্গভবনে পৌঁছান স্বরাষ্ট্র সচিব। রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে স্বরাষ্ট্র সচিব বঙ্গভবন থেকে বের হয়ে যান। তবে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করে দেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল শনিবার রাত ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে গণমাধ্যমে এ কথা জানান।

এর আগে, শনিবার সন্ধ্যায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গণমাধ্যমকে জানান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের প্রাণভিক্ষার আবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রীর গুলশানের বাসভবনে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি। ‘এই ফাইলের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে আমার কিছু বলা সমীচীন নয়’- মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী।

পেছন ফিরে দেখা

বহুল আলোচিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী চট্টগ্রামের রাউজান থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দায়িত্ব পালন করেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা ফজলুল কাদের চৌধুরী পাকিস্তান সরকারের স্পিকার ও একাধিকবার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার কারণে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কারাগারে যান তিনি। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মধ্যেই ১৯৭৩ সালের ১৮ জুলাই মারা যান তিনি।

একইভাবে মুজাহিদ ২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত চারদলীয় জোট সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ফরিদপুর থেকে বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করেও বিজয়ী হতে পারেননি কখনও।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর রাজধানীর বনানী থেকে হরতালে নাশকতার মামলায় গ্রেফতার করা হয়। এরপর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের ২৩টি অভিযোগ গঠন করে। ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ২৩টি মামলার মধ্যে হত্যা, নির্যাতন, গণহত্যা ইত্যাদির মোট নয়টি মামলায় দোষী প্রমাণিত হওয়ায় ফাঁসির আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে তার পক্ষ থেকে আপিল করা হলে আপিলের রায়েও এ রায় বহাল রাখা হয়। গত ১৮ নভেম্বর আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে আলোচিত-সমালোচিত এই রাজনীতিক রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করলে তা খারিজ করে দিয়ে ফাঁসির রায় বহাল রাখেন সর্বোচ্চ আদালত।

এদিকে, জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ধর্মীয় অনুভূতির একটি মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেফতার হন। ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২০১২ সালের ২১ জুন তার বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, দেশান্তরে বাধ্য করাসহ সাতটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি প্রমাণ হওয়ায় মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১৫ সালের ১৬ জুন আপিল বিভাগ ফাঁসির রায় বহাল রাখেন। ১৮ নভেম্বর রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্ট। খবর:দ্যা রিপোর্ট

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Essex 206/10 v Nottinghamshire 380/10 & 35/1 *

Glamorgan 283/10 v Derbyshire 207/3 *

Kent 359/6 & 197/10 * v Warwickshire 125/10

Leicestershire/1 & 427/10 * v Middlesex 233/10

Surrey 459/10 v Somerset 180/10 & 18 *

Sussex 552/10 v Durham 202/4 *

Worcestershire 361/4 & 247/10 * v Lancashire 130/10

Northamptonshire 282/10 v Gloucestershire 155/5 & 62/10 *

Hampshire 153/3 * v Yorkshire 350/10

England 100 * v Australia 310/8