বরেন্দ্র জাদুঘর থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রত্নবস্তুর সন্ধান মেলেনি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত দেশের একমাত্র শতবর্ষি ঐতিহ্যবাহী বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর থেকে হারিয়ে যাওয়া ১৮৫ প্রত্নবস্তুসহ প্রায় তিন হাজার দুর্লোভ বস্তু এখনো উদ্ধার হয়নি। এ নিয়ে কোনো তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট বা দায়িত্বরত ব্যক্তিদের মাঝে। আবার ঘটনার সেঙ্গ জড়িতদের বিরুদ্ধেও এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র মতে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫৭তম সিন্ডিকেট সভায় বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর থেকে প্রাচীন মূর্তি, টেরাকোটাসহ বিভিন্ন প্রত্নবস্তু, প্রকাশনা ও মুদ্রা খোয়া যাওয়ার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্যরা সরেজমিনে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর পরিদর্শন করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন বলেও তখন জানানো হয়। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর ওই সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জাদুঘরে মুদ্রা ছাড়া নিবন্ধিত নানা ধরনের চার হাজার ৪০৭টি প্রত্নবস্তুুর মধ্যে ১৮৫টি আর পাওয়া যাচ্ছে না। পাঁচ হাজার ৯৭১টির নিবন্ধিত মুদ্রার মধ্যে ৩৩টি এবং ১৩ হাজার ৯৩৩টি গ্রন্থের মধ্যে ৮৫টি পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া ১৩ হাজার ৫৭৬টির প্রকাশনার (পুস্তুক, পুস্তিকা, গ্রন্থ জার্নাল ইত্যাদি) মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে না তিন হাজার ৫২টি। এর আগে এ ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে পুরো বিষয়টি রিভিউ করার জন্য একটি উপকমিটি গঠন করা হয়।
এদিকে ঘটনাটি তদন্তে গঠিত উপকমিটি ওই বছরই বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট ও জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে অনিয়মের বিষয়টি তুলে ধরে সুপারিশসহ চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন বলেও নিশ্চিত হওয়া গেছে। কিন্তু এখনো এ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সূত্র। এ নিয়ে রাজশাহীবাসীর মাঝে ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষোভ।
জাদুঘর সূত্র মতে, ১৯১০ সালে প্রতিষ্টিত হয় রাজশাহী বরেন্দ্র জাদুঘর। এরপর থেকে এই জাদুঘরে সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করার জন্য একের পর এক সংগ্রহ করা হয় ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী নানা প্রত্নতত্বতত্ত সামগ্রী। ১৯৬৪ সালে রাজশাহীর ঐতিহ্যের ধারক এই জাদুঘরটি হস্তান্তর করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট। তখন থেকেই বরেন্দ্র জাদুঘরটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আওতাধীন পরিচালিত হয়ে আসছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষককে পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে এই জাদুঘরটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে বরেন্দ্র জাদুঘরে প্রায় ১২ হাজার মূল্যবান দুশ্প্রাপ্য মূর্তি ও ৩০০ বছর পূর্বের মোঘল আমলের ছয় শতাধিক বিভিন্ন মূদ্রা রয়েছে। এ ছাড়াও এই জাদুঘরের গ্রন্থাগারে গবেষণা করার জন্য রয়েছে ইতিহাসসমৃদ্ধ বই-পুস্তক।
জাদুঘরের পশ্চিম দিকের দ্বিতল ভবনটি হলো আবহমান বাংলাদেশ কক্ষ। এই কক্ষটি নির্মাণ করা হয় ১৯৯৩ সালে।
জাদুঘর সূত্র মতে, ১৯৮৬ সাল থেকে পরবর্তি প্রায় ১৮ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০০৪ সাল পর্যন্ত এ জাদুঘর থেকে প্রায় ৮৫টি প্রত্নতত্বতত্ব সামগ্রী চুরি হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, উমা মহেশ্বর বা স্বামী-স্ত্রীর মূর্তি, একাধিক বিষ্ণুমূর্তি, সূর্য মূর্তি, পেটমোটা বৌদ্ধমূর্তি জম্ভালা, হিন্দু ধর্মালম্বীদের কালীর একটি রূপ চন্ডিমূর্তি, বৌদ্ধদের প্যাগোডা, ব্রহ্মা মূর্তি ও বুদ্ধমূর্তি, দুর্লভ টেরাকোটা, কারুকার্য খচিত ইট ও অন্যান্য প্রত্নতত্ববস্তু।
এ ছাড়াও প্রায় তিন হাজার প্রকাশনা সামগ্রী ও দূর্লভ পুস্তক, পুস্তিকা, গ্রন্থ, জার্নাল ইত্যাদিও খোয়া গেছে ওই সময়ের মধ্যে। জাদুঘরের একজন পরিচালক দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে সব প্রতœসম্পদের হিসেব বুঝে না দেওয়ার কারণে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ কমিটি করে ইনভেন্টরি (মজুদ) প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে গিয়ে এ প্রতœতত্ত সামগ্রীসহ অন্যান্য দুর্লোভ বস্তু খোয়া যাওয়ার বিষয়টি জানতে পারে।
সূত্র আরও জানায়, গত ৪৫৭তম সভায় জাদুঘরের প্রত্নতত্বসম্পদসহ সকল বিষয়ের পুর্নাঙ্গ ইনভেন্টরি করার জন্য বর্তমান পরিচালক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সুলতান আহমদকে আহবায়ক করে তিন সদস্যের একটি নতুন ইনভেন্টরি কমিটি গঠন করা হয়। ইনভেন্টরি কমিটির অপর তিন সদস্য হলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মাহাবুবুর রহমান, চিত্তরঞ্জন মিত্র ও নূরুল কাইয়ুম।ওই কমিটি দুই বছর ধরে কাজ করে ১০০ বছরের সংগৃহীত প্রত্নসম্পদসহ অন্যনা বিষয়ের ওপর একটি পূর্নাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করেন। এ থেকেই জাদুঘরের প্রত্নসম্পদ ও তিন হাজার বস্তু হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে।
এই প্রতিবেদনটি জাদুঘর উপদেষ্টা পরিষদের ৫৯তম সভায় উপস্থাপিত হয় এবং ২০১২ সালের ১১ জুন অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের সাধারণ সভায় অনুমোদিত হয়। এরপর গত ২৪ সেপ্টেম্বর পরিষদের বিশেষ সভার কার্যবিবরনীতে প্রকাশ করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে বর্তমান উপপরিচালক মোঃ জাকারিয়া বলেন, ‘আমি এখন আর ওই দায়িত্বে নাই। কাজেই সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে প্রত্নতত্ব খোয়া যাওয়া বিষয়টি সঠিক বলে শুনেছি। কিন্তু সেটিও ঘটেছে আমার আমলের অনেক আগে। ১৯৮৬ সালের পরে হয়তো।’
জানতে চাইলে অধ্যাপক সুলতান আহমদ বলেন, ইনভেন্টরি কমিটির পক্ষ থেকে গোপন প্রতিবেদনসহ সুপারিশ মালা করে বিশ্বদ্যিালয় প্রশাসনকে জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই সুপারিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে গিয়ে আটকে আছে। সিন্ডিকেটে এ নিয়ে পরবর্তি সিদ্ধান্ত না হওয়ায় দোষিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহম্মদ মিজানউদ্দীন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটেই বিষয়টি নিয়ে পরবর্তি সিদ্ধান্ত হবে। তবে এ নিয়ে এখনো সিন্ডিকেটে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।’

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

England Under-19s 7 * v India Under-19s 519/10

Nepal Under-19s 92/5 * v Malaysia Under-19s 89/10

Afghanistan Under-19s 305/6 v Singapore Under-19s 81/10 *

Ireland Under-19s 200/9 v Jersey Under-19s 10/1 *

Denmark Under-19s v Scotland Under-19s 249/7 *

Chepauk Super Gillies v VB Thiruvallur Veerans 42/2 *